বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ঘাটতিকে বড় করছে আদানির বিদ্যুৎ আমদানি

ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থের পণ্য ও সেবা আমদানি করে বাংলাদেশ। এ আমদানির বিপরীতে রফতানির পরিমাণ খুবই সামান্য। দেশটির সঙ্গে শুরু থেকেই বড় অংকের বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ।

ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থের পণ্য ও সেবা আমদানি করে বাংলাদেশ। এ আমদানির বিপরীতে রফতানির পরিমাণ খুবই সামান্য। দেশটির সঙ্গে শুরু থেকেই বড় অংকের বাণিজ্য ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এ ঘাটতিকে এখন আরো বড় করে তুলছে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় স্থাপিত আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানি।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। সে অনুযায়ী ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই এ আমদানির মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)। আর এরও আগে থেকে ভারত থেকে জিটুজি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ আমদানি করছিল বাংলাদেশ। তবে দেশটিতে সরকারিভাবে আমদানীকৃত বিদ্যুতের চেয়ে আদানির বিদ্যুতের মূল্য অনেক বেশি। বিপিডিবির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে ব্যয়কৃত অর্থের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি যায় আদানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রফতানির অর্থমূল্য ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ। একই অর্থবছরে ভারত থেকে পণ্য আমদানি বাবদ বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৯৪ হাজার ৩৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ। এ হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ৫০ কোটি টাকা। আর বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি হয়েছে ৯ হাজার ২২৩ কোটি টাকার।

সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পণ্য রফতানি বাবদ বাংলাদেশের অর্জিত অর্থমূল্য ছিল ১৭ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। আর পণ্য আমদানি বাবদ বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৯ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে গত অর্থবছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ সাড়ে ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ৪১২ কোটি টাকা।

ভারত থেকে জিটুজি ভিত্তিতে আনা বিদ্যুৎ আদানির চেয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় ধরনের গোপনীয়তার সঙ্গে ভারতীয় কোম্পানিটির সঙ্গে করা অসম এক ক্রয়চুক্তির কারণে বিপিডিবির ব্যয় ও ঋণচাপ ক্রমেই বেড়েছে। একই সঙ্গে বড় হয়েছে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির আকারও। বর্তমানে আমদানীকৃত বিদ্যুতের মূল্যের সিংহভাগই আদানিকে পরিশোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সমস্যা আমদানিতে না। সমস্যা হলো আমরা রফতানি করতে পারছি না। ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজারে বাংলাদেশের রফতানি মাত্র প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে যে হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ বিল দেয়া হচ্ছে, তাতে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে কিনা, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আদানির সঙ্গে চুক্তির ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়েছে কিনা।’

বাংলাদেশে গড্ডার বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে রফতানি শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর ঘোষণা আসে আরো পরে। সে সময় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর তিন মাসেও আদানি পাওয়ারকে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি বিপিডিবি।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৩ ঘণ্টার এক ঝটিকা সফরে ঢাকা আসেন আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি। ঢাকায় নেমেই তিনি দেখা করতে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। বৈঠকের পর সেদিনই ভারতে ফিরে যান আদানি। বিদ্যুৎ বিভাগসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ কেন্দ্র বুঝিয়ে দিতে আসার কথা বলা হলেও সেদিন আদানির বাংলাদেশে আগমনের বড় উপলক্ষ ছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ বাংলাদেশের বকেয়া থেকে যাওয়া অর্থের প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। গৌতম আদানির ওই সফরের দুই সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ আদানি পাওয়ারকে প্রথম ১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বিল পরিশোধ করা হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, এরপর আওয়ামী লীগ আমলে বিদ্যুৎ কেনা বাবদ আদানিকে প্রতি মাসে ২০-২৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হতো। তবে একপর্যায়ে কোম্পানিটিকে বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধে বকেয়া বাড়তে থাকে।

গণ-অভ্যুত্থানে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর যাবতীয় বকেয়া পরিশোধের দাবি তুলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয় আদানি পাওয়ার। একপর্যায়ে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দেয়া হয়। এ অবস্থায় গত নভেম্বরে আদানি গ্রুপকে প্রতি মাসে অন্তত ১০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের লক্ষ্য হাতে নেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। বাংলাদেশ ব্যাংকও আদানির ২০২৪ সালের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বকেয়া পরিশোধ এবং ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কেনা বিদ্যুতের আর্থিক গ্যারান্টি দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে ডলারের প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছেন বিপিডিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদানির বিদ্যুৎ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়িয়ে তুলছে ঠিকই। তবে সামনের দিনগুলোয় বিদ্যুতের বাণিজ্যকে যদি দ্বিমুখী করে তোলা যায়, তাহলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাণিজ্য ঘাটতি অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। বিদ্যুৎ বাণিজ্য এখন পর্যন্ত একমুখী আছে, এটা যদি দ্বিমুখী করা যায় বা বাংলাদেশ থেকেও রফতানি করা যায় তাহলে হয়তো ঘাটতি পর্যায়ক্রমে কমে আসবে।’

ভারত থেকে প্রধানত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয় বাংলাদেশকে। কিন্তু ভারতের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য রফতানিতে বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ সবসময় বড় অংকের ঘাটতিতেই থেকেছে।

দুই দেশের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারত থেকে বাংলাদেশে শীর্ষ আমদানি পণ্য হলো তুলা। দ্বিতীয় শীর্ষ পণ্য হলো সিরিয়াল বা খাদ্যশস্য। পাশাপাশি আমদানি হয় খনিজ ও জ্বালানি পণ্য। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হওয়া প্রধান পণ্য হলো তৈরি পোশাক।

ইন্ডিয়া বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভারত থেকে বাংলাদেশে যে বিদ্যুৎ আসছে, সেটা বাস্তবে বড় ধরনের দুর্নীতি। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি। রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এটা করা হয়েছে। ২০০৬ সালের আগে সাফটা চুক্তি হয়। সেটির আওতায় ১১৩টি পণ্যে শুল্ক সুবিধা রয়েছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে ২৪-২৫টি পণ্য ভারতে যায়। ২০০৬ সালের পর গত ১৫ বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দরকষাকষি করতে পারেনি। ফলে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানির ব্যাপ্তি তেমন বাড়েনি। বিদ্যুৎ আমদানিতে যে অর্থ পরিশোধ করতে হয়, তার মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভারত ১৬০ কোটি মানুষের দেশ। আর বাংলাদেশ ১৮ কোটি মানুষের দেশ। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি মূল্যায়নে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমানে দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের স্থিতি বিবেচনায় নিলে রফতানি সম্প্রসারণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আবার আমদানিও কমেছে। দুই দেশের নিজ নিজ মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সেদিকেই আমরা অগ্রসর হচ্ছি বলে আশা করি। বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি যদি বাংলাদেশের জন্য চাপের হয় সেটা অনেক আগে থেকেই আছে। এর সঙ্গে গত কয়েক বছরে বিদ্যুৎ আমদানি বাবদ যে অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে তাতে বাণিজ্য ঘাটতি স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।’

আরও